তারেক রহমান এখন বিএনপির চেয়ারম্যান। দেশে ফেরার দিন থেকেই তাঁর রাজনীতি নিয়ে একটা আস্থার ভাব লক্ষ করা গেছে। কেউ বলবেন, এটা গুণগত পরিবর্তন। এ যেন এক অনবদ্য তারেক রহমান।
এর চূড়ান্ত ফল পাওয়ার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে সকালের সূর্য দেখেই, সারাদিনের আন্দাজ করা যায়।
যাঁরা দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর কর্ণধার বা সম্পাদক, দেশের জনগণ তাঁদের ওপরই বেশি আস্থা রাখে সংবাদের ভেতর সংবাদ খুঁজতে। ১০ জানুয়ারি সম্পাদকেরা সবাই একত্র হয়ে কথা বললেন। তাঁরা কথা বললেন তারেক রহমানের পরিবর্তন ও তাঁর থেকে প্রত্যাশা নিয়ে। তাঁদের চোখ দিয়ে যদি আমরা তারেক রহমানকে পর্যবেক্ষণ করি, আমি বলব, এটা অনেক বড় আস্থা এবং প্রত্যাশা।
মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমি এক তারেক রহমানকে চিনতাম ২৩ বছর আগে। আমি ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে প্রথম তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। আমি এখন দেখি, ২৩ বছরে তারেক রহমান বদলে গেছেন, আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে তাঁর মধ্যে।’
নিউজ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, ‘এমন সময়ে সবাই সমবেত হয়েছি, যখন একটা পুরোনো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটেছে। যেই জন্য মানুষের এত আত্মদান, সেই আত্মদানের ভিত্তিতে মানুষের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি আমরা। কিন্তু সেটা এখনো গড়ে ওঠে নাই।’
দেশের বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকদের সম্মিলিত আস্থা থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করছে, তা ঘোচাতে তাঁরা এ মুহূর্তে তারেক রহমানের ওপরই ভরসা রাখতে চান।
মাত্র মাস দু-এক আগের কথা। দেশে ফিরে আসা নিয়ে তারেক রহমানের একটা ফেসবুক পোস্ট দেশের রাজনীতিতে দারুণ অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছিল। বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় দল, যে দলের ওপর দেশের বিভিন্ন ধারার মধ্যপন্থী জনগণ ভরসা রাখছিল, তারা দারুণ হতাশ হয়েছিল।
তখন প্রশ্ন ছিল, বিএনপির শীর্ষ নেতা দেশে আসতে পারছেন না, তাহলে দলের কী হবে? অন্য কেউ কি আছেন দলের হাল ধরতে পারবেন?
তখন বিএনপির অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে উদ্বিগ্ন ছিল দেশের উদারপন্থী ও মধ্যপন্থীরা। প্রশ্ন উঠবে, বিএনপি—যাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি অভিযোগ আছে, তারা কেন হয়ে উঠল মধ্যপন্থীদের একমাত্র ভরসা?
তারেক রহমান এখন পর্যন্ত কোনো বড় ভুলও করেননি। ধীরস্থিরভাবে অগ্রসর হয়ে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছেন জনগনের মাঝে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছেন শোক জানাতে এবং তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়া নিয়ে কথা বলেছেন। তারেক রহমানের প্রতি দুই পরস্পরবিরোধী দেশের এই আস্থা, নিজ দেশের জনগণের আস্থাও বাড়িয়েছে।
নির্বাচনী উদ্যোগেও তারেক রহমান ধীরস্থিরভাবে এগোচ্ছেন। দলের বিদ্রোহীদের সঙ্গে সঙ্গে কথা বলে তিনি নির্বাচনী পথ কিছুটা পরিষ্কার করেছেন। শরিকদের আসন নিয়েও খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিশ্চিন্ত করেছেন। তারেক রহমানের কিছু ব্যক্তিগত ভালো আচরণও অনেকের চোখে পড়েছে এবং প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বিএনপিই একমাত্র রাজনৈতিক দল, যারা রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে নিয়ে বিচারবহির্ভূত প্রতিহিংসা পরিহার করেছে। এটা তাদের ভোটের রাজনীতি হতে পারে বা ভদ্রতার রাজনীতিও হতে পারে। তবে এ দেশের জনগণ যে মব সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন, সম্ভবত বিএনপি নেতারা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন।
জামায়াত বড় জোট করে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। তাদের জোটে ধর্মভিত্তিক ও জনসমর্থন বিহীন দলগুলো যোগ দিয়েছে। এই জোটে তারা দুজন পথভ্রষ্ট মুক্তিযোদ্ধাকে জোগাড় করেছে। তবে তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য, জুলাই আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের দল এনসিপিকে জোটভুক্ত করা। তবে এতে ২৪ শের আকাংখাকে ধুলিস্যাৎ করেছে।
তবে রাজনীতিতে বিএনপির দৃশ্যমান প্রভাব ও অগ্রগতি জামায়াতের জন্য আতংকের কারন হয়ে উঠে। এটা যে জামায়াতের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরিয়েছে, তা অনেকটাই আজ স্পষ্ট। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে জাতীয় সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন। এতে আগ্রহও প্রকাশ করে।
তারেক রহমান জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর থেকেই জামায়াতকে বিএনপির সঙ্গে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তখন জামায়াত একলা চলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিজেদের বিএনপির বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়। হঠাৎ জামায়াত আমিরের সুর বদল রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কারণটা নির্বাচনী মাঠে জামায়াতের দুর্বলতা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জামায়াতের জোটমিত্র ইসলামী আন্দোলনও তাদের হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য এবং নির্বাচনী জোটে থেকে বের হয়ে এসেছে।
রাজনীতিতে বিএনপির অপরিহার্যতা এবং তারেক রহমানের প্রতি জনগনের আস্থা বিএনপিকে তাদের জন্য নতুন পরিচিতি সৃষ্টির সুযোগ এনে দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই আস্থা তারা কত দিন ধরে রাখতে পারবে, ভবিষ্যতে অনেকভাবে তার পরীক্ষা হবে। বিএনপিকে তাদের কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে আস্থার মর্যাদা। ইতিমধ্যে তারেক রহমান এর ইংগিত দিয়েছেন।
বড় দলের গরিমা ও ক্ষমতার আস্ফালন খুঁজে বেরাবার লোক কিন্তু বিএনপিতে কম নেই। তারেক রহমান যদি তাঁদের সামলাতে না পারেন, তাহলে মানুষ ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতেই শান্তি খুঁজবে এবং সেটা আবার জামায়াতকে বড় সুযোগ এনে দেবে। এমনটা কখনো হতে দেয়া যাবেনা। ইতিমধ্যে তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে দমনের ইংগিত দিয়েছেন। সবচেয়ে প্রথম তার নিজ দলের চাঁদাবাজ, অযোগ্য, সমাজের ঘৃন্নিত ব্যাক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দরকার হলে দল ও রাষ্ট্রের জন্য নিজ দল থেকে বহিষ্কার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এতেই দল, জনগন এবং রাষ্ট্রের কল্যান।