
দুই দশক পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই সাক্ষাৎকার ছিল এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, এক রাজনীতিকের আত্মসমালোচনা এবং এক রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্নদ্রষ্টার নীরব আহ্বান, যার কথার প্রতিটি পরতে পরতে উঠে এসেছে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপরেখা।
গত ৬ ও ৭ অক্টোবর যখন এই সাক্ষাৎকারের খবর প্রকাশিত হয়, তখন পুরো জাতি নড়েচড়ে বসে। দুই দিনের জন্য মানুষের দৈনন্দিন রুটিন বদলে যায়। এখন মানুষের মুখে মুখে এই সাক্ষাৎকারের গল্প। চায়ের কাপে উঠেছে প্রবল ঢেউ, মানুষের হৃদয়ে লেগেছে দোলা; অন্তরে এক অবারিত স্বপ্নকে আলিঙ্গন করার হাতছানির গল্প যেন দানা বাঁধতে শুরু করেছে।
বিবিসি বাংলার এই সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান যেন সত্যি সত্যি ফিরে পেলেন নিজের সেই দেশ, যেটিকে তিনি কখনও ছেড়ে যাননি; শুধু শারীরিকভাবে দূরে ছিলেন, কিন্তু আগলে রেখেছেন গভীর মায়া ও ভালোবাসায়। “আমি ১৭ বছর প্রবাসে থাকলেও মন-মানসিকতায় বাংলাদেশেই আছি।” এই একটি বাক্যই যেন তাঁর পুরো সাক্ষাৎকারের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। মনে হচ্ছিল যেন পুরো বাংলাদেশ একসঙ্গে কথাটি বলছে। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও তিনি যে প্রতিটি সিদ্ধান্তে, বক্তব্যে ও কর্মে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতিফলন রেখেছেন, তা এবার নিজের কণ্ঠেই স্বীকার করলেন।
সাক্ষাৎকারের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযত, স্বচ্ছ, প্রজ্ঞাবান ও আত্মবিশ্বাসী।
যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হলো জুলাই–অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকা নিয়ে, তিনি মোটেও নেতৃত্বের গৌরব নিজের কাঁধে নেননি। বরং বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আমি মাস্টারমাইন্ড নই। এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।
এই উত্তরে লুকিয়ে আছে এক গভীর রাজনৈতিক দর্শন। মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার প্রতিদানস্বরূপ সকলের মন জয় করার শক্তি রয়েছে এই কথাটিতে।
বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি দেখেছে আত্মপ্রচারণা ও ক্রেডিট নিজের ঘাড়ে তুলে নেওয়ার অপরাজনীতি; তার বিপরীতে তারেক রহমান যে ভঙ্গি দেখালেন, সেটিই রাজনৈতিক ‘প্যারাডাইম শিফট’।
নিজের ও পরিবারের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গে তিনি ছিলেন শান্ত ও পরিমিত। একটিও অভিযোগের সুর নয়, বরং ছিল আত্মবিশ্বাস ও নৈতিক দৃঢ়তা। প্রতিশোধের বার্তা নয়, তবে ছিল আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিচারের প্রক্রিয়ার আভাস। তিনি বলেন, আমি নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, জেলজুলুম, সবকিছু পেরিয়ে এখানে দাঁড়িয়েছি। এই বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত প্রতিরোধের কথা নয়, এটি এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীর পরিণত মানসিকতার প্রকাশ।
এই সাক্ষাৎকারে তাঁর ভেতরে অবস্থান করা মানুষটিও যেন উন্মোচিত হয়েছে, তিনি একজন পুত্র যিনি অসুস্থ মাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে নির্যাতিত হতে দেখে কষ্ট পান; একজন নেতা, যিনি তাঁর দলকে সংস্কার ও ঐক্যের পথে ফেরাতে চান; এবং একজন সচেতন নাগরিক, যিনি বিশ্বাস করেন, “প্রতিশোধ নয়, বিচারই হোক আমাদের রাজনীতির ভিত্তি।”
তারেক রহমানের বক্তব্যের প্রতিটি স্তরে আইনের প্রতি এক অদ্ভুত শ্রদ্ধাবোধ লক্ষ্য করা গেছে।
তিনি বললেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, আদালতে তার কোনো প্রমাণ নেই। আমি চাই, সবকিছু আইন ও ন্যায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হোক।”
এই বক্তব্য একদিকে যেমন তাঁর ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি, তেমনি এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
বিবিসির প্রতিবেদকের সরাসরি প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশ কি আজ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে বলে আপনি মনে করেন?
তিনি কোনো সংশয় না রেখে সোজাসাপটা বললেন, গণতন্ত্র কাগজে-কলমে থাকে না, গণতন্ত্র টিকে থাকে মানুষের মনের মধ্যে। আমি সেই জনগণের ওপরই বিশ্বাস রাখি।
রাজনীতিতে যারা জনমতকে ভয় পায়, তারা ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে; কিন্তু যারা জনগণের প্রতি বিশ্বাস রাখে, তারাই ভবিষ্যৎ তৈরি করে। তারেক রহমানের এই বিশ্বাস তাঁকে এক অদম্য শক্তিতে পরিণত করেছে, দেশ থেকে দূরে থেকেও জনগণের মননে তিনি সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, আমরা প্রায় ৬৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলন করেছি, সবাইকে নিয়েই রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে চাই।
এছাড়াও বিএনপির রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা প্রণয়নের সময় সবার সঙ্গে পরামর্শ করে, মতামত নিয়েই করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনায় সবাইকে নিয়ে পথ চলার একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে তাঁর কথার মাঝে। তাঁর কাছে রাজনীতি মানে ‘ক্ষমতা দখল নয়’, বরং রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সাজানো, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, গৃহিণী, তরুণ, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কিংবা সাংবাদিক—সবারই থাকবে রাষ্ট্রের অংশীদারিত্ব। তাঁর ভাষায়, “একটি নির্বাচন হলেই যে সব সমস্যা রাতারাতি ঠিক হয়ে যাবে, তা নয়। কিন্তু সমস্যাগুলোকে যখন আপনি অ্যাড্রেস করা শুরু করবেন, তখনই ধীরে ধীরে সমস্যার সংখ্যা কমতে শুরু করবে।”
প্রধানমন্ত্রী পদে প্রত্যাশার প্রশ্নে তিনি উত্তর দেন সংযমের সঙ্গে, বলেন
আমি রাজনৈতিক কর্মী। নির্বাচনে অংশ নেব ইনশাল্লাহ। তবে প্রধানমন্ত্রী হবেন কি না, সেটি জনগণ ও দলের সিদ্ধান্ত।
তিনি দ্রুতই দেশে ফিরে আসবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন, এমনকি দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেবেন বলেও বোঝা গেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হবেন কিনা, সে ব্যাপারে জনগণের ওপরই আস্থা রাখতে চান—জনগণ চাইলে প্রধানমন্ত্রী হবেন। আর দল থেকে তিনিই প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন কিনা, সেটাও দলের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিতে ইচ্ছুক তিনি।
এছাড়াও দলের মনোনয়ন প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, মনোনয়ন শুধু দলের বিষয় নয়—যাদের মানুষের সঙ্গে সংযোগ আছে, তারাই মনোনয়ন পাবেন। অর্থাৎ, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থার এক চমৎকার চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর কথার মাঝে।
এই বিশ্বাসই আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়। কারণ গণতন্ত্র তখনই টিকে থাকে, যখন নেতারা ক্ষমতার চেয়ে জনগণের ওপর আস্থা রাখেন।
আর সেই অবারিত আস্থার প্রতীকের নামই আজ—তারেক রহমান।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।।
সম্পাদক: এবিএম আজরাফ টিপু,
মোবাইল : ০১৯১৩-৬৫১০৫৭
ইমেইল : chatona.tv@gmail.com
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: টাউয়াদী, নরসিংদী-১৬০২