শিরোনাম :
নরসিংদীতে বইমেলার উদ্বোধন রায়পুরা উপজেলা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ নরসিংদীতে সাধু সঙ্গ অনুষ্ঠিত নরসিংদীর শীলমান্দীতে প্রধান শিক্ষকের হাতে শিক্ষিকা লাঞ্ছিত জার্মানে মোশাররফ হোসেন ভূইয়ার লেখা দুটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নরসিংদীতে স্ত্রী হত্যায় পলাতক স্বামীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ নরসিংদীতে আ.লীগ নেতা এড. আসাদোজ্জামানের স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত শালুরদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সম্পন্ন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সৃজনশীল মেধা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জার্মানির চ্যান্সেলর এর বৈঠক
শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১১:২৪ অপরাহ্ন

সংগ্রাম-স্বাধীনতা: প্রেরণায় বঙ্গমাতা :মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

প্রতিনিধির নাম / ২৩৩ বার
আপডেট : মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০২৩

৮ আগস্ট ২০২৩। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৯৩তম জন্মবার্ষিকী। তার জন্মবার্ষিকীর এবারের প্রতিপাদ্য ‘সংগ্রাম-স্বাধীনতা, প্রেরণায় বঙ্গমাতা’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত সাধারণ বাঙালি নারী-বাঙালি স্ত্রী ও বাঙালি মায়ের প্রতিচ্ছবি। অতি অল্প বয়সে সংসারে ঢুকে পড়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কিশোর বয়স থেকে শুরু করে আমৃত্যু তার পাশে থেকে তাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী ও কর্মময় জীবনে তার পাশে ছায়া হয়ে থেকেছেন, তাকে সাহায্য-সহায়তা করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু যেমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত থেকে ইতিহাসের অংশ হয়েছেন, তেমনি শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব তার আন্দোলন-সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অংশীদার, ভুক্তভোগী ও প্রেরণাদাত্রী হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ও মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদেরকে কতটা ভালোবাসতেন, তা যেমন জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তেমনি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুর আজীবন সহযোগী হিসেবে বাংলার মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পরামর্শদাত্রী, বঙ্গবন্ধুর জেলে থাকাকালীন দলীয় নেতাদের সাহায্যকারী, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর সংসারের কাণ্ডারি। মূলত তিনিই সন্তানদের লালন-পালন, লেখাপড়া ইত্যাদির দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার আত্মীয়-পরিজনদের দেখাশোনা করেছেন।

শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব যার ডাক নাম রেণু, ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হক এবং মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। শেখ ফজিলাতুন নেছার পিতামহ শেখ মোহাম্মদ আবুল কাশেম এবং বঙ্গবন্ধুর পিতামহ শেখ আব্দুল হামিদ ছিলেন পরস্পর চাচাতো ভাই। শেখ মুজিব ও রেণুর বিবাহের ঘটনাটি ছিল চমকপ্রদ। বঙ্গবন্ধু তার রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন—“‍আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স ১২-১৩ বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাওয়ার পর ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাব।’ মুরুব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হলো। … রেণুর বয়স তখন বোধহয় ৩ বছর। রেণুর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তার মা মারা যান। একমাত্র রইল তার দাদা। দাদাও রেণুর ৭ বছর বয়সে মারা যান। তারপর সে আমার মা’র কাছে চলে আসে। আমার ভাই বোনদের সাথে রেণু বড় হয়।”
একই গ্রন্থের অন্য এক জায়গায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘যদিও আমাদের বিবাহ হয়েছে ছোটবেলায়, ১৯৪২ সালে আমাদের ফুলশয্যা হয়।’ বেগম মুজিব যখন সংসার জীবনে প্রবেশ করেন, তখন বঙ্গবন্ধু কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা করেন। প্রথম থেকেই স্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন ও রাজনীতি, মানুষের সাহায্যকারী, তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়ার স্বভাব মেনে নিয়েছেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ ও ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বঙ্গবন্ধু যখন অসহায় মানুষের সাহায্যার্থে কাজ করেন, বেগম ফজিলাতুন নেছা তার পাশে থেকে তাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হলে তার সেবা করেন। নিজের সঞ্চিত টাকা বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন।
১৯৪৭ সালের অক্টোবরে যখন তাদের জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনার জন্ম হয় বঙ্গবন্ধু তখন কলকাতায়। এরই মধ্যে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দমন তথা বাঙালি মুসলমানদের রক্ষা করা ও সাহস জোগানের জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে কলকাতায় থেকে যান। সন্তান জন্মের কিছুদিন পর সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে পূর্ব বাংলায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিজ বাড়িতে এসে কিছুদিন পরিবারের সঙ্গে থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন। রাজনীতি করার কারণে বঙ্গবন্ধু পরিবারকে খুব বেশি সময় দিতে পারতেন না। বেগম মুজিব টুঙ্গিপাড়ায় থেকে সন্তান দেখাশোনাসহ সংসারের দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন শুরু হলে তিনি সন্তানদের দেখাশোনা, লেখাপড়া করানোসহ স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। একে একে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা ও তিন পুত্রের জননী হন।
১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হলে বেগম মুজিব ছোট দুই সন্তান শেখ হাসিনা ও শেখ কামালকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। কিন্তু অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে শেখ মুজিবকে জেলে ঢোকান। বাংলার মানুষের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা, শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্ত করার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে তাকে বারবার জেলে যেতে হয়েছে। সে সময় দক্ষ মাঝির মতো বেগম মুজিব সংসারের হাল ধরেছেন। ভাড়া বাসায় থেকেছেন। নিজে ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ক্রমান্বয়ে তিনিও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহচর ও পরামর্শক হয়ে ওঠেন। বঙ্গবন্ধুর জেলে থাকা অবস্থায় বেগম মুজিব ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সংগঠিত রাখতেন। তাদেরকে পরামর্শ ও টাকা-পয়সা দিয়ে সহায়তা করতেন। তার স্মরণশক্তিও ছিল প্রখর। মাঝেমধ্যে জেল গেটে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে পার্টির খবরা-খবর দিতেন এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনাবলি শুনে এসে পার্টির লোকদের জানাতেন।
বাংলার কাদা-জল ও গ্রামীণ পরিবেশ থেকে ওঠে আসা একজন গৃহিণী শেখ মুজিবের সংস্পর্শে এসে সম্পূর্ণ রাজনীতিসচেতন, করিৎকর্মা নারী হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিটি সংগ্রামে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অসামান্য অবদান রয়েছে। আমার মা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব সারা জীবন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশের মানুষের জন্য চিন্তা করতে প্রেরণা জুগিয়েছেন।’ বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী লেখার পেছনেও রয়েছে বেগম মুজিবের অবদান ও অনুপ্রেরণা। তিনি জেলগেটে একদিন স্বামীকে বলেন, ‘বসেইতো আছ, লেখ তোমার জীবন কাহিনী।’ বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আরো লেখেন—‘আমার স্ত্রী যার ডাকনাম রেণু, আমাকে কয়েকটা খাতা কিনে জেলগেটে জমা দিয়েছিলেন। জেল কর্তৃপক্ষ যথাযথ পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরো একদিন জেল গেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।’ বঙ্গবন্ধুর এ উক্তি থেকে বোঝা যায় খুঁটিনাটি বিষয় থেকে কত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে বেগম মুজিবের অবদান ছিল।
বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন হিসাব করলে দেখা যায় যে তিনি জীবনের ১৩ বছরের অধিক সময় কারান্তরালে কাটিয়েছেন। ১৯৪৯ সালের শেষদিকে কারারুদ্ধ হয়ে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একনাগাড়ে দুই বছরেরও বেশি সময় তাকে কারাগারে থাকতে হয়েছে। ১৯৫৮ সালের পর তাকে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে প্রায় ১৪ মাস কারান্তরালে রাখা হয়। মাঝেমধ্যেই তার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে বেগম মুজিব একদিকে সংসার সামলিয়েছেন, ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করেছেন, অন্যদিকে পার্টির লোকজন ও ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। বঙ্গবন্ধু অনেক সময় ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতেও দলীয় সভা করতেন। সে সময় বেগম মুজিব নিজে রান্না করে লোকদের খাইয়েছেন। ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৬৮-৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর জেলে থাকাকালীন ছাত্র-জনতার আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি নেপথ্য থেকে নেতৃত্ব ও পরামর্শ দিয়েছেন। ছাত্র ও আওয়ামী লীগ নেতারা ওই সময় প্রায়ই বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে এসে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিতেন। অসীম ধৈর্য ও দেশপ্রেমের অধিকারী বেগম মুজিব নানা সংকটে সংসার নির্বাহসহ ছেলেমেয়েদের লালন-পালন ও লেখাপড়া চালাতে গিয়ে কষ্ট করেছেন। কোনোদিন স্বামীর প্রতি অভিযোগ দূরে থাক, বরং আপসহীন সংগ্রামে স্বামীকে উৎসাহ দিয়েছেন।
১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের পর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে পশ্চিম পাকিস্তান যাওয়ার জন্য সরকার মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব করেন। আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে প্যারোলে মুক্ত করতে রাজি হন। কিন্তু বেগম মুজিব বড় মেয়ে শেখ হাসিনার মাধ্যমে ক্যান্টনমেন্টে বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর পাঠান বঙ্গবন্ধু যেন প্যারোলে মুক্তি না নেন। সরকার তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিলেই তিনি গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করবেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বেগম মুজিবের ভূমিকার বিষয়ে তাদের কনিষ্ঠা কন্যা শেখ রেহানা স্মৃতিচারণে লিখেছেন—‘জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি আমার বাবা কারাবন্দি। মা তার মামলার জন্য উকিলদের সঙ্গে কথা বলছেন, রাজবন্দি স্বামীর জন্য রান্না করে নিয়ে যাচ্ছেন, গ্রামের শ্বশুর-শাশুড়ি ও আত্মীয়-স্বজনের খবরাখবর রাখছেন। আবার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করছেন, যারা বন্দি তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিয়ে টাকাও পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কারাগারে দেখা করতে গিয়ে স্বামীর কাছে বাইরের সব খবর দিচ্ছেন এবং তার কথাও শুনে আসছেন। কাউকে জানানোর থাকলে ডেকে জানিয়েও দিচ্ছেন। এরপর আছে তার ঘর-সংসার। এর মধ্যে ছেলেমেয়েদের আবদার, লেখাপড়া, অসুস্থতা আনন্দ-বেদনা সবকিছুর প্রতিও লক্ষ রাখতে হয়। এত কিছুর পরও তার নিজের জন্য সময় খুঁজে নিয়ে তিনি নামাজ পড়েছেন, গল্পের বই পড়েছেন, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গল্প করেছেন। আমার মা কী ভীষণ দায়ভার বহন করেছেন। ধীরস্থির এবং প্রচণ্ড রকম সহ্যশক্তি তার মধ্যে ছিল। বিপদে, দুঃখ-বেদনায় কখনো ভেঙে পড়তে দেখিনি।’ মা সম্পর্কে মেয়ের এরূপ স্পষ্ট বর্ণনার পর তার সম্পর্কে জানার ও বোঝার আর কিছু বাকি থাকে না। একজন শাশ্বত বাঙালি স্ত্রী ও মায়ের প্রতিচ্ছবির পাশাপাশি ফুটে ওঠে তার চরিত্রের দৃঢ়তা ও অসাধারণ কর্তব্যপরায়ণতা।
বেগম মুজিবের প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও তিনি ছিলেন অতিশয় বুদ্ধিমতী ও রাজনীতিসচেতন। নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দিতেন। ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোয় প্রতিদিন ছাত্র-জনতা মিছিল করে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যেতেন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা প্রদর্শন করা হয়। ২২ মার্চ রাতে খেতে বসে বঙ্গবন্ধুকে কিছুটা চিন্তিত দেখে বেগম মুজিব জানতে চান, ‘পতাকা ওড়ানোর ব্যাপারে কি কোনো সিদ্ধান্ত নিলেন?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘না নিতে পারিনি। আমি পতাকা ওড়াতে চাই। একটাই ভয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এখনো ঢাকায়। পাকিস্তানিরা বলবে, আলোচনা চলা অবস্থাতেই শেখ মুজিব নতুন পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এ অজুহাত তুলে তারা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সামরিক হামলা চালাবে।’ এ অবস্থায় বেগম মুজিব পরামর্শ দিলেন—‘আপনি ছাত্রনেতাদের বলুন আপনার হাতে পতাকা তুলে দিতে। আপনি সেই পতাকা ৩২ নম্বরে ওড়ান। কথা উঠলে আপনি বলতে পারবেন, আপনি ছাত্র-জনতার দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন।’ বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের জানিয়ে দেন ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে তিনি ৩২ নম্বরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ২৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে এবং মিছিল করে সেই পতাকা বঙ্গবন্ধুর ৩২ নং সড়কের বাড়িতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে হস্তান্তর করেন, যা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে উড়িয়ে দেন। পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া সচিবালয় থেকে শুরু করে সারা পূর্ব পাকিস্তানের অফিস-আদালতে ও বাড়িতে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় ভাষণে বঙ্গবন্ধু কী বলবেন তা নিয়ে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনা। তাজউদ্দীন আহমদ লিখিত ভাষণের একটি খসড়াও বঙ্গবন্ধুকে দিয়েছেন। সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমদ প্রমুখ ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে গেছেন। বঙ্গবন্ধু নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে শয়নকক্ষে এসে বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। পরের ঘটনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এভাবে বর্ণনা করেন—‘আমি মাথার কাছে বসা, মা মোড়াটা টেনে নিয়ে আব্বার পায়ের কাছে বসলেন। মা বললেন, মনে রেখো তোমার সামনে লক্ষ মানুষের বাঁশের লাঠি। এ মানুষগুলোর নিরাপত্তা এবং তারা যেন হতাশ হয়ে ফিরে না যায় সেটা দেখা তোমার কাজ। কাজেই তোমার মনে যা আসবে তাই তুমি বলবা। আর কারো কোনো পরামর্শ দরকার নেই। তুমি মানুষের জন্য সারা জীবন কাজ করেছ। কাজেই কী বলতে হবে তুমি জানো।’ বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণে তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। আলোচনার দরজা খোলা রাখলেন। শর্তসাপেক্ষে পার্লামেন্টের অধিবেশনে বসার কথা বললেন এবং আরো বললেন—‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ একদিকে যেমন স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে জনতা বাড়ি ফিরলেন, অন্যদিকে পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ থেকে বাঙালি জনতা রক্ষা পেল। এরূপ ভাষণ প্রদানে পরামর্শ ও নির্ভরতা তিনি স্ত্রীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ নয় মাস মুজিব পরিবার বন্দি ছিলেন ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে। বঙ্গবন্ধু তখন পশ্চিম পাকিস্তানে কারাবন্দি। স্বামীর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা সত্ত্বেও তিনি সীমাহীন ধৈর্য, সাহস ও বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। পাকিস্তানি সেনাদের বুঝতে দেননি দুই ছেলে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেছেন। বাসায় দুই মেয়ে ও ছোট ছেলে রাসেলকে আগলে রেখেছেন।
স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে নিজ স্ত্রীর সম্পর্কে একটি সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছেন—‘আমার স্ত্রীর মতো সাহসী মেয়ে খুব কমই দেখা যায়। আমাকে যখন পিন্ডির ফৌজ বা পুলিশ এসে জেলে নিয়ে যায়, আমার ওপর নানা অত্যাচার করে, আমি কবে ছাড়া পাব বা কবে ফিরে আসব ঠিক থাকে না, তখন কিন্তু সে কখনো ভেঙে পড়েনি। আমার জীবনের দুটি বৃহৎ অবলম্বন। প্রথমটি হলো আত্মবিশ্বাস, দ্বিতীয়টি হলো আমার স্ত্রী, আকৈশোর গৃহিণী।’ শেখ ফজিলাতুন নেছা আজীবন বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকেছেন, সুখ-দুঃখের সাথী হয়েছেন এবং ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই শাহাদতবরণ করেন। নিয়তির বিধানে বঙ্গবন্ধুর জীবন সাথী মরণেও সাথী হলেন।
শেখ ফজিলাতুন নেছা একদিকে যেমন ছিলেন স্নেহময়ী মা—সন্তানদের লালন-পালন ও শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে বড় করেছেন, অন্যদিকে ছিলেন স্বামীর রাজনীতির প্রেরণাদাত্রী ও পরামর্শক। শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদান অবিস্মরণীয়। তাই তিনি বঙ্গমাতা। এ মহীয়সী নারীর ৯৩তম জন্মবার্ষিকীতে জানাই তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অসীম কৃতজ্ঞতা।
( কপি পোষ্ট )

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান। বর্তমানে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত

Facebook Comments Box


এ জাতীয় আরো সংবাদ